আন্দোলনের সূচনা: শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ
২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে চায়ের কাপের পর্ব থেকে শুরু হয় এই আন্দোলনের সূত্রপাত, ২০১৮ সালেও একবার এই আন্দোলন হয়ে ছিল কিন্তু ফ্যাসিষ্ট সরকারের মিথ্যাচারিতার জন্য তা ব্যর্থ হয়, কোটা সংস্কার ছিল এই আন্দোলনের সূচনা সরকারী চাকুরিতে প্রবেশের সময় কোটা বন্টন একটা বিশাল বাধা যার কারনে ব্যর্থ হয় অনেক মেধাবির সুষ্ট নিয়োগ আর এই সুযোগে চলে ঘুষ বানিজ্য, স্বজন প্রিতী, এবং নানান দূর্নিতীর আখড়া পাশাপাশি ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব তো আছেই এই সব কিছুর প্রেক্ষাপট ই কোটা আন্দোলনের সূচনা নিচের ম্যাপে কোটা বন্টনের একটা চিত্র তুলে ধরা হলঃ
কোটা ব্যবস্থা: সমস্যার মূল
সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। ২০২৪ সালে মোট ৫৬% কোটা নির্ধারণ করা হয়, যেখানে মেধার জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৪৪%। এই কোটা ব্যবস্থায় বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত ছিল:
- মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য: ৩০%
- নারীদের জন্য: ১০%
- জেলাগুলোর জন্য বিশেষ কোটা: ১০%
- অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য: ৫%
- প্রতিবন্ধীদের জন্য: ১%
এই সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে মেধাবীদের জন্য চাকরির সুযোগ ক্রমশ কমে যেতে থাকে। কোটা পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও শূন্য পদগুলো মেধার ভিত্তিতে পূরণ করা হচ্ছিল না। এই বৈষম্যমূলক পদ্ধতির ফলে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
তাই ২০২৪ সালের ৩রা জুলাই থেকে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ আবারও কোটা সংস্কারের দাবিতে একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলে শুরুতে যার নাম ছিল কোটা আন্দোলন। প্রায় এক দশক আগে ২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের জন্য ব্যাপক আন্দোলন হলেও, সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দেয়, যা ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনের জন্ম দেয়।
শিক্ষার্থীরা ন্যায্য অধিকার দাবি করে মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলনে নেমে আসে। কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রথমে এই আন্দোলন শুরু করে, যা দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনের মূল দাবি:
- কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা।
- কোটা বাতিলের বদলে যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস করা।
- কোটা পূরণ না হলে শূন্য পদে মেধাবীদের নিয়োগ দেওয়া।
পরের দিন ৪ই জুলাই আন্দোলন চলমান থাকে এবং একে একে বাকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলো আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে রাজপথে অবস্থান নেয়। এই দিন বিভিন্ন স্থানে রোড ব্লক শুরু হয়। জাহাংগীর নগর বিশবিদ্যালয়ের সাধারন ছাত্র রা রাস্তা বন্ধ করে অবস্থান নেয়।
শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সংহতি
এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শ্রমিক, কৃষক, এবং দিনমজুরদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যোগদান আন্দোলনকে আরো ব্যাপক করে তোলে।
সরকারের দমনপীড়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
আন্দোলন দমনে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পুলিশের গুলি, আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার, এবং বিরোধী কণ্ঠ রোধের চেষ্টা সত্ত্বেও জনসাধারণ আন্দোলনে অটল থাকে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষত জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরকারের এই দমননীতির তীব্র সমালোচনা করে।
৫ই আগস্ট: শেখ হাসিনার পলায়ন
আন্দোলন চরমে পৌঁছালে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে। শেখ হাসিনা এবং তার বোন শেখ রেহেনা সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় রাতের অন্ধকারে গোপনে দেশ ত্যাগ করেন। জানা যায়, তারা ভারতের একটি সুরক্ষিত এলাকায় আশ্রয় নেন। এ সময় পুরো দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীরা উল্লাসে ফেটে পড়ে।
এই পলায়ন আন্দোলনের সাফল্যের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং শাসকগোষ্ঠীর পতনের নিশ্চিত বার্তা দেয়।
পরিণাম ও প্রভাব
শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এ সরকার গণতান্ত্রিক নির্বাচন পরিচালনা এবং নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলন শুধুমাত্র একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে জনগণের মতামত এবং অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে।
উপসংহার
২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের প্রতীক হয়ে থাকবে। এই আন্দোলন দেখিয়েছে যে সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে তারা যে কোনো অত্যাচারী শাসনব্যবস্থাকে পরাজিত করতে পারে। শেখ হাসিনার পলায়ন এবং একটি নতুন যুগের সূচনা বাংলাদেশের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
